,

একজন সফল ও মহৎ মানুষের গল্প : পর্তুগাল প্রবাসী আব্দুল আলিম

“কুষ্টিয়ার পাটিকাবাড়ীর উজ্জ্বল নক্ষত্র পর্তুগাল প্রবাসী আব্দুল আলিম”

=আবুল কালাম আজাদ সানি=

অতি শৈশবে কবি কামিনী রায়ের কবিতার এই চরণ ক’টি আমাকে মুগ্ধ করেছিলো৷
”পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি,
এ জীবন মন সকলই দাও,
তার মতো সুখ কোথাও কি আছে? আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে’
সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।”

কবিতার পাশাপাশি আমরা জীবনে কত রকম গল্প শুনি। শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের গল্পের মধ্যেই বসবাস। কিছু গল্প বাস্তব, কিছু গল্প কাল্পনিক। কিছু আছে বাস্তবতা আর কল্পনার মিশেল। আবার বাস্তব এমন কিছু গল্প আছে, যা কল্পনাকেও হার মানায়।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পাটিকাবাড়ী ইউনিয়নের আকাশে ফুঁটে উঠা ফোয়ারার মত আলোকিত এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ও মহান মানুষের নাম আব্দুল আলিম৷

একজন জীবন সংগ্রামী মানুষ আব্দুল আলিম৷ একজন সফল মানুষ আব্দুল আলিম ৷ একজন বিশিষ্ট দানবীর ও ভালবাসার মানুষ আব্দুল আলিম৷

আব্দুল আলিম একটি নাম। আব্দুল আলিম একটি গল্প। রূপান্তরের গল্প। মানুষকে ভালোবাসার গল্প। মানুষকে সঙ্গে নিয়ে জীবনের নানা বাঁক পার হয়ে এগিয়ে চলার গল্প। এ বদল একদিনে ঘটেনি। দীর্ঘদিনের লড়াই সংগ্রাম, চড়াই-উতরাই, ঘাত- প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে নিরন্তর এ রূপান্তর। এ রূপান্তর ভাবনার জগৎ, ভালোবাসার জগতের রূপান্তর। স্বপ্ন ও প্রত্যাশার রূপান্তর।

বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত এলাকা পাটিকাবাড়ী। সাংস্কৃতিকখ্যাত রাজধানী কুষ্টিয়া জেলার সদর উপজেলাধীন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার অন্তর্গত কুমারনদ ঘেষা একটি সাজানো-গোছানো ইউনিয়ন পাটিকাবাড়ী।

সেই সৌন্দর্যপ্রিয় ইউনিয়ন ও গ্রাম পাটিকাবাড়ীর এক মধ্যবিত্ত পরিবারে পিতা-মাতার আদর-সোহাগে বেড়ে ওঠা আব্দুল আলিম চোখে বড় হওয়ার স্বপ্ন-কাজল মেখে, দুরন্ত যৌবনের জেদ নিয়ে দেশের সীমানা ডিঙায়। অর্থ-বিত্তে, ধন-সম্পদে বড় হতে হবে। নিজ পরিবার, পিতা-মাতা, আত্মীয়-পরিজন সহ এলাকার মানুষকে সুখী করতে হবে। চোখে হাজার রঙিন স্বপ্ন নিয়ে শুরু করলেন জীবন সংগ্রাম। স্বপ্নপূরণের লড়াই। অনেক চড়াই-উতরাই, লড়াই-সংগ্রাম শেষে জায়গা করে নিলেন পর্তুগালের একটি শহরে।

মূলধন-সাহস, সততা। আর তার সঙ্গে শ্রম, মেধা, অধ্যাবসায়। তিনি অচিরেই সাফল্যের সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে ওপরের দিকে উঠতে লাগলেন। হয়ে উঠলেন সাফল্যের বরপুত্র আব্দুল আলিম। স্বপ্ন তার হাতের মুঠোয়। সামনে তার অপার সম্ভাবনা।

সৃষ্টিকর্তা তার সকল চাওয়া-পাওয়া ও স্বপ্ন-আশাগুলো পরিপূর্ণতায় রুপদান করায় আব্দুল আলিম সর্বদা শুকরিয়া আদায়ের মধ্যদিয়ে সর্বশ্রেণীর মানুষের মাঝে নিজেকে ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন ৷ এলাকার মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়ন, মানুষের সেবা, মানুষের উপকার করা ও কল্যাণ সাধনের মধ্যেই তিনি নিজের জীবনের অভীষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিলেন।

হাজার হাজার মাইল দুরে থাকলেও আব্দুল আলিমের মন পড়ে থাকে এলাকার উন্নয়নে, মন কাঁদে অসহায় দুস্থ্য মানুষগুলোর জন্য৷ তাই তিনি মাত্র এক সপ্তাহের জন্য ছুটে এলেন সাধারণ মানুষের একান্ত কাছে৷

মনের ভেতর জমে থাকা অনেক দিনের ভালবাসাগুলো উজার করে মানুষের মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার সেই প্রকাশ ঘটে বাস্তব ক্ষেত্রে, নানা কর্মে। আব্দুল আলিমের আগমনে পাটিকাবাড়ী বাজারে বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে এসেছে অসহায় সহ বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ৷ তিনি যাকে দেখেছেন তাকেই একান্ত আপন ভেবে জড়িয়ে ধরেছেন, করেছেন আর্থিক সহযোগীতা৷ এ যেন এক মানবিক আলিম৷ জনগণের আলিম৷

এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নে দিয়েছেন আর্থিক অনুদান৷ পাটিকাবাড়ী বাজারে নির্মানাধীন বহুমূখী মাদ্রাসা ও হেফজখানায় ২০ লক্ষ টাকা, পাটিকাবাড়ী জামে মসজিদের উন্নয়নে ১৩ লক্ষাধীক টাকা অনুদানসহ এলাকার ঈদগাহ ময়দান, বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে লক্ষ লক্ষ টাকা অনুদানের মাধ্যমে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন আব্দুল আলীম৷ নিজের ইউনিয়ন ছাড়াও পার্শ্ববর্তী ঝাউদিয়া ইউনিয়নের বাখাইল জামে মসজিদে অনুদান দিয়েছেন ১লক্ষ টাকা৷

এছাড়াও তিনি প্রতি বছরের বিভিন্ন সময় এলাকার দুস্থ্য-গরীব-অসহায়দের মাঝে ৮-১০ লক্ষ টাকার যাকাত প্রদান, ঈদ উৎসবে শাড়ী-লুঙ্গি সহ মাসব্যাপী ইফতার সামগ্রী হিসেবে ১০-১২ লক্ষ টাকার অনুদান দিয়ে আসছেন নিয়মিত৷

মাত্র এক সপ্তাহে এলাকাবাসীকে যা দিয়েছেন বিনিময়ে তার চেয়ে অনেক বেশি স্নেহ, ভালবাসা ও সম্মান পেয়েছেন বলে জানান আব্দুল আলিম৷ পর্তুগালে ফিরে যাবার সংবাদে এলাকায় ভীড় জমান অসংখ্য শুভাকাঙ্খি৷ অশ্রুভরা ভালবাসায় শিক্ত হয়ে আব্দুল আলিম আবার পাড়ি জমান নিজ কর্মস্থল পর্তুগালের উদ্দেশ্যে৷

আব্দুল আলিম প্রবাসের কর্ম ব্যস্ততার মাঝেও পর্তুগালে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের অন্যতম প্রাচীন সংগঠন “বাংলাদেশ কমিউনিটি অব পোর্তো” কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব সফল ভাবে পালন করছেন৷

কর্মের সততা ও আন্তরিকতায় উদ্ভাসিত আব্দুল আলিম সর্বদা মানুষের হৃদয়ে। তিনি সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য কাজ করেন। রাজনীতি করে
নিজের ভাগ্য গড়ার আদর্শে বিশ্বাস করেন না। মানুষই তার ধ্যান-জ্ঞান, মানুষই তার শেষ কথা। তার মননে, ভাবনায়, চেতনায় কেবলই মানুষ আর মানুষ। মানবসেবায় পরম ধর্ম৷ তাই মানুষকে ভালোবাসার পরীক্ষায় তিনি বিজয়ী হয়ে অমরত্ব লাভ করতে চান।

এলাকার মানুষের কাছে আব্দুল আলিম হলেন একজন মহৎ প্রাণ পুরুষ। সেই প্রাণে আর কিছুই থাকে না, থাকে শুধু মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। মানুষের প্রতি অঙ্গীকার। ধন-যশ কিছু নয়, শুধু মানুষের ভালোবাসা। মানুষের ভালোবাসা তার রাজমুকুট। মানুষের হৃদয় তার সিংহাসন।

তার নামের খ্যাতি আর কিছু নয়, তিনি বাঙালী, তিনি কুষ্টিয়া জেলার পাটিকাবাড়ীর লোক। সেই তার প্রথম এবং শেষ পরিচয়।

পরিশেষে আবারও কবি কামিনী রায়ের দু’টি চরণ মনে পড়লো,
এরা যদি জানে-
এদেরও তো গড়েছেন নিজে ভগবান্ ,
নবরূপে দিয়েছেন চেতনা ও প্রাণ ;
সুখে দুঃখে হাঁসে কাঁদে স্নেহে প্রেমে গৃহ বাঁধে, বিধে শল্যসম হৃদে ঘৃণা অপমান, জীবন্ত মানুষ এরা মায়ের সন্তান৷

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট ৷

এ জাতীয় আরো সংবাদ


ফেসবুকে আমরা

ফেসবুকে আমরা