,

বাংলা নববর্ষ, পান্তা ভাত এবং বাঙালিয়ানা

শফিকুল ইসলাম রিপন:- শুরু করবো জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ-এর একটি কথা দিয়ে। তিনি বলেছেন,

‘আজকাল আমরা পহেলা বৈশাখের দিন পান্তাভাতের আয়োজন করি। পান্তাভাত নিয়ে বাড়াবাড়ি কম হচ্ছে না। কবে কোন ফাইভস্টার হোটেল বলে ফেলবে,আমাদের কাছে পাওয়া যাবে স্ট্রবেরি ফ্লেভারড পান্তা—আমি সেই অপেক্ষায় আছি। এভাবে আমাদের সংস্কৃতি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’

বৈশাখ মানেই পান্তা-ইলিশ! বৈশাখের সকালে পান্তা-ইলিশ না খেলে বাঙালির নববর্ষ পালনে যেনো পরিপূর্ণতা আসে না। আর তাই নববর্ষ শুরুর আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় ইলিশ সংগ্রহ। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দিক দিয়ে বৈশাখ উদযাপনের সাথে এই খাবার দু’টির কোনও যুক্ততা না থাকলেও বাঙালির মধ্যে এ নিয়ে কৌতুহলের শেষ নেই। আর তাই এখন নববর্ষ উদযাপনের প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে পান্তা-ইলিশ।

বৈশাখের সাথে যেভাবে জড়ালো পান্তা-ইলিশ

বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে শহুরে বাঙালী বাংলা নববর্ষকে ঘটা করে উদযাপন শুরু করে। এই mgq বাঙালিয়ানার প্রতীক হিসেবে ভাজা ইলিশ মাছ সহযোগে পান্তা ভাত রেওয়াজে পরিণত হয়। একুশ শতাব্দীর প্রথম দশকে নববর্ষের সকালে ইলিশ মাছ সহযোগে পান্তা ভাত বাঙালি সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে পান্তা উৎসবের মাধ্যমে অনেকেই নতুন বছরকে বরণ করে নেয়ার সংস্কৃতি চালু ও পরিব্যাপ্ত হয়েছে।

মাছে-ভাতে বাঙালি—এটা তো খুব পুরোনো একটা কথা। বাঙালি মাত্রই মাছ-ভাত খেয়ে বেড়ে ওঠেন, জীবন ধারণ করেন। করবেন এটাই স্বাভাবিক। কারণ এই দুটি জিনিসের সহজলোভ্যতা বাংলাদেশে বেশি। বাঙালি সারা বছরই মাছ-ভাত খান। তবে এই মাছ-ভাত বিশেষ করে পান্তাভাত খাওয়ার উপলক্ষ হয় যদি কোনো একটা বিশেষ দিন তাহলে সেটা অবশ্যই চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
যে পান্তা-ইলিশকে বৈশাখ বা নববর্ষকে উপলক্ষ করে খাওয়ার হিরিক পড়ে যায় সেই বৈশাখের সাথে এর আদৌ কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সংস্কৃতিকর্মীরা একথা মানছেন যে—বাংলা নববর্ষ উদযাপনের ঐতিহ্যের সঙ্গে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।

পান্তা ভাত গ্রামীণ বাঙালি জনগোষ্ঠির কাছে বেশ জনপ্রিয় একটি খাবার। রাতের খাবারের জন্য রান্না করা ভাত উদ্বৃত্ত থেকে গেলে সংরক্ষণের জন্য তা পানিতে ভিজিয়ে রাখা হতো। পরদিন সকালে এই পানিতে রাখা ভাতের নাম হতো পান্তা ভাত। পান্তা ভাত গ্রামীণ মানুষ সকালের নাশতা হিসাবে খেয়ে থাকে। সাধারণত লবণ, কাচা মরিচ বা শুকনো মরিচ পুড়িয়ে ও পেঁয়াজ মিশিয়ে পান্তা ভাত খাওয়া হয়।
নির্দিষ্ট পরিমাণ ভাতকে পানিতে প্রায় এক রাত ডুবিয়ে রাখলেই তা পান্তায় পরিণত হয়। ভাত মূলত পুরোটাই শর্করা। ভাতে পানি দিয়ে রাখলে বিভিন্ন গাজনকারি ব্যাক্টেরিয়া বা ইস্ট শর্করা ভেঙ্গে ইথানল ও ল্যাকটিক এসিড তৈরি করে। এই ইথানলই পান্তাভাতের ভিন্ন রকম স্বাদের জন্য দায়ী।

ইলিশ

ইলিশ বাংলাদেশের একটি জাতীয় মাছ। বাঙালিদের কাছে এটি খুব জনপ্রিয় একটি মাছ। এবং এটি একটি সামূদ্রিক মাছ, যা ডিম পাড়ার জন্য বাংলাদেশ ও পূর্ব ভারতের নদীতে প্রবেশ করে। এছাড়াও ইলিশ খাদ্য হিসেবে ভারতের বিভিন্ন এলাকা যেমন,পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, ত্রিপুরা, আসামেও অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি মাছ। বাংলা ভাষা,ভারতের আসামের ভাষায় ইলিশ শব্দটি পাওয়া যায় এবং তেলেগু ভাষায় ইলিশকে বলা হয় পোলাসা, গুজরাটে ইলিশ মাছ মোদেন (স্ত্রী) বা পালভা (পুরুষ) নামে পরিচিত। ইলিশ অর্থনৈতিক ভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ গ্রীষ্মমন্ডলীয় একটি মাছ।

আমরা হুজুগে বাঙালি। যা পাই তা-ই কোনো কিছু বাছবিচার না করে; প্রয়োজনীয় নাকি অপয়োজনীয় চিন্তা না করে গ্রহণ করে ফেলি। পান্তা-ইলিশও তেমনি দুটি উপকরণ যা কেবল বৈশাখ এলেই কদর বেড়ে যায়।
বৈশাখকে উপলক্ষ করে ইলিশের চাহিদা বেড়ে যায়। ঢাকা সহ সারা দেশের কাঁচাবাজারগুলোতে এই সময় সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য পণ্য হয়ে ওঠে ইলিশ। তাই পহেলা বৈশাখের আগে অনেকেই এক জোড়া ইলিশ মাছ কেনার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন সবাই। আর মাছ বিক্রেতারাও এর সুযোগ নেন পুরোদমে।

ঢাকার বাজারগুলোতে বৈশাখের আগে চারটি ইলিশ সবোর্চ্চ এক লাখ টাকা দামেও বিক্রি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া ৫ শ থেকে তিন/চার হাজারে মাঝারি সাইজের ইলিশ বিক্রি হতে যায়। দাম বেড়ে যাবে এমন আশঙ্কায় অনেকে অবশ্য আগেভাগেই মাছ কিনে ফ্রিজে রেখে দেন।
এবার তাহলে ইতিহাসটা একটু জানা যাক, বৈশাখে খরার মাস। এ সময় কোনো ফসল না হওয়ায় কৃষকদের হাতে পয়সাও থাকতো না। সুতরাং তাদের পক্ষে ইলিশ কিনে খাওয়া সম্ভব হতো না। সুতরাং এটা মোটেও সত্যি নয় যে, কৃষকরা নববর্ষ উদযাপনে পান্তা ইলিশ খেয়ে বছর শুরু করতো। গ্রামবাংলায় নববর্ষের উৎসবই ছিল খুব ছোট আকারে।

কৃষাণী আগের রাতে একটি নতুন ঘটে কাঁচা আমের ডাল ভিজিয়ে রাখতো, চাল ভিজিয়ে রাখতো। সকালে কৃষক সেই চাল পানি খেত,এবং শরীরে কৃষাণী পানিটা ছিটিয়ে দিত। তারপর সে হালচাষ করতে যেত। দুপুরবেলায় পান্তা খেতে পারতো কাঁচা মরিচ,পেঁয়াজ দিয়ে। কখনো কখনো একটু শুটকি,একটু বেগুন ভর্তা ও একটু আলু ভর্তা দিয়ে খেত।
গরমের সময় পান্তা খেলে অনেকে মনে করে শরীর এবং পেট ঠাণ্ডা থাকে—অনেকেই এটা মনে করে থাকেন। কিন্তু নববর্ষে ইলিশ মাছ খাওয়া কতটা জরুরি? আর বাংলার ঐতিহ্যের সাথে তার সম্পর্কই বা কতটা?সংস্কৃতিকর্মীরা এখন এমনই প্রশ্ন তুলছেন।

সাম্প্রতিককালে লক্ষ করা যাচ্ছে ‘পান্তা-ইলিশ’কে বাংলা নববর্ষ উৎসবের প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ নিয়ে এখন শহুরে নব্যধনিক ও উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের মাতামাতির শেষ নেই। ফলে পহেলা বৈশাখের দিন এখন শহরের অলিগলি, রাজপথ, পার্ক, রেস্তোরাঁ—সর্বত্রই বিক্রি হয় পান্তা-ইলিশ।
এমনকি এখন অভিজাত হোটেলগুলোতেও শুরু হয়েছে পান্তা-ইলিশ বিক্রি এবং এই পান্তা-ইলিশ খাওয়া এখন একশ্রেণির মানুষের বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু আবহমানকাল থেকেই পহেলা বৈশাখের সঙ্গে এই পান্তা-ইলিশের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা শহুরে নব্য বাঙালিদের আবিষ্কার। এর মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতিকে সম্মান জানানোর পরিবর্তে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে।

এ জাতীয় আরো সংবাদ


ফেসবুকে আমরা

ফেসবুকে আমরা