,

কুষ্টিয়ার ইতিহাসে ড. সন্জীদা খাতুন

ড. এমদাদ হাসনায়েন

বাঙালির সংস্কৃতির অগ্রযাত্রা ও বিকাশে যে ক’জন নিবেদিতপ্রাণ সারাজীবন কাজ করে চলেছেন তাদের অন্যতম ড. সন্জীদা খাতুন। সংস্কৃতির আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন অসা¤প্রদায়িক চেতনা। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব। তিনি একাধারে লেখক, গবেষক, সংগঠক, রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী, সংগীতজ্ঞ ও শিক্ষক সন্জীদা খাতুন কুষ্টিয়ার কৃতি সন্তান ৪ এপ্রিল ১৯৩৩ সালে (তখনকার নদীয়া) জেলার কুমারখালি থানার লক্ষীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা বিখ্যাত পÐিত ব্যক্তি ও জাতীয় অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার হোসেন। সন্জীদা খাতুন বাংলাদেশের একজন খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ ও সঙ্গীতজ্ঞ। তিনি কাজী আনোয়ার হোসেনের বোন এবং রবীন্দ্রসংগীত বিশেষজ্ঞ ওয়াহিদুল হকের স্ত্রী। সন্জীদা খাতুন ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মানসহ স্নাতক, ১৯৫৫ সালে ভারতের বিশ^ভারতী বিশ^বিদ্যালয়, শান্তিনিকেতন থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি ভারতের বিশ^ভারতী বিশ^বিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন এবং পরবর্তীতে একই বিশ^বিদ্যালয় থেকে পিএইচডি উত্তর গবেষণাও সম্পন্ন করেন। সন্জীদা খাতুনের কর্মজীবন শুরু হয় শিক্ষক হিসেবে। শান্তিনিকেতন থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক হন। দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা থেকে অবসরগ্রহণ করেন। ১৯৬০ সালে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’ প্রতিষ্ঠা করেন ও বর্তমান সভাপতি। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে সে প্রতিষ্ঠা করে ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’। রমনার বটমূলে বর্ষবরণ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে বাঙালিত্বের দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তুলবার সাধনায় ব্রতী সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। সারা জীবন ধরে তিনি শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি, মননশীলতার চর্চা করে নিজেকে উন্নীত করেছেন এক ঈর্ষণীয় অবস্থানে। তিনি তৈরি করেছেন স্বকীয় এক পরিমÐল, যা থেকে উত্তরকালের নবীনরা পেতে পারেন উদ্দীপনা আর অনুপ্রেরণা। প্রচলিত ধারার বাইরে ভিন্নধর্মী একটি শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নালন্দা’র সভাপতি। জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদেরও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তিনি ড. কাজী মোতাহার হোসেন ফাউন্ডেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। অধ্যাপক ড. সন্জীদা খাতুন ২০০৮ সালে বিশ^ভারতী বিশ^বিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি.লিট ‘দেশিকোত্তম’ লাভ করেন।

১৯৬১ সালে পাকিস্তানের সামরিক শাসনামলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন ও রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের আন্দোলনে শুরু থেকেই অংশগ্রহণের পাশাপাশি নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন তিনি। জীবনে যেখানেই কর্মব্যপদেশে ছিলেন, সেখানেই রেখেছেন নিজ কৃতির অমোচ্য ছাপ। পাকিস্তান আমলে বাংলা একাডেমিতে অত্যল্পকালের পেশাজীবনে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মহার্ঘ কৃতি ‘আঞ্চলিক ভাষার অভিধান’ এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন যেমন, তেমনি ফিরোজা বেগম সংকলিত কয়েক খÐের নজরুল সংগীত স্বরলিপি পুস্তকাকারে প্রকাশে রেখেছেন উদ্যোগী ভূমিকা। সন্জীদা খাতুনের মোট ২৫টি বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত’, ‘রবীন্দ্র সঙ্গীতের ভাবসম্পদ’, ‘ধ্বনি থেকে কবিতা’, ‘অতীত দিনের স্মৃতি’, ‘প্রভাতবেলার মেঘ ও রৌদ্র’, ‘রবীন্দ্রনাথ: বিবিধ সন্ধান’, ‘ধ্বনির কথা আবৃত্তির কথা’, ‘স্বাধীনতার অভিযাত্রা’, ‘সাহিত্য কথা সংস্কৃতি কথা’, ‘জননী জন্মভ‚মি’, ‘তোমারি ঝর্ণাতলার নির্জনে’, ‘রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথ’ এবং ‘সহজ কঠিন দ্ব›েদ্ব ছন্দে’ ইত্যাদি। সান্জীদা খাতুন সম্পাদিত রবীন্দ্রসংগীত বিষয়ক গ্রন্থের প্রথম খÐ ‘গীতবিতান: তথ্য ও ভাবসন্ধান’ প্রকাশ করেছেন।

সন্জীদা খাতুন কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ পেয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ১৯৯০ সালে তাকে একুশে পদক, ১৯৯৮ সালে বাংলা একাডেমির সা’দত আলী আখন্দ পুরস্কার, ১৯৯৯ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ২০১০ সালে বাংলা একাডেমির রবীন্দ্র পুরস্কার এবং রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত), দেশিকোত্তম পুরস্কার (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত) অর্জন করেন। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সম্মানজনক ফেলোশিপ লাভ করেন। ১৯৬৮ সালে নজরুলগীতির মিক্সড এক্সটেনডেট প্লে-রেকর্ড এবং ১৯৭০ সালে রবীন্দ্রনাথের দুটি গানের এক্সটেনডেন্ট প্লে-রেকর্ড পাকিস্তান থেকে বের হয়। ঢাকা এবং কলকাতা থেকে তার অসংখ্য গানের সিডি বের হয়েছে। ১৯৮৮ সালে সন্জীদা খাতুনকে কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট কর্তৃক ‘রবীন্দ্র তত্ত¡াচার্য’ উপাধিতে ভ‚ষিত করা হয়। একই বছর তাকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার কর্তৃক রবীন্দ্রস্মৃতি পুরস্কার প্রদান করা হয়। এছাড়াও তিনি বেগম জেবুন্নেছা ও কাজী মাহবুব জনকল্যাণ ট্রাস্টের স্বর্ণপদক ও সম্মাননা (১৯৯০), অনন্যা পুরস্কার (২০০০) এবং বিজয় দিবস পদক (২০০৯) লাভ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগে ‘আহমদ শরীফ অধ্যাপক চেয়ার’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রথমবারের মত ‘আহমদ শরীফ অধ্যাপক চেয়ার’ পদে নিয়োগ পেয়েছেন প্রাক্তন অধ্যাপক, বিশিষ্ট সংস্কৃতি সেবী ও গবেষক ড. সন্জীদা খাতুন। তিনি ২০১৭ সালে এই পদে অধিষ্ঠিত থাকাকালে বাংলা বিভাগে গবেষণায় নিয়োজিত থাকেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ প্রবর্তিত আহমদ শরীফ চেয়ারে আসীন হয়ে অল্প সময়ের ব্যবধানে নজরুল ও জসীম উদ্দীন বিষয়ে যখন পরপর প্রদান করলেন দুটো বিশদ বক্তৃতা, তখন শ্রোতাসাধারণ বলছিলেন যে এই বয়সে এমন স্থিত প্রাজ্ঞ গবেষক-মন সত্যি বিরল।
—————————
বই প্রাপ্তি স্থান:
কোবাডাক হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার, লাশকাঁটার মোড়, কুষ্টিয়া
বই মেলা, এন এস রোড, কুষ্টিয়া
বই সমাবেশ, স্টেশন রোড, কুষ্টিয়া
বিদ্যাকোষ লাইব্রেরী, কোর্ট স্টেশনের পূর্বে, কুষ্টিয়া
বই নীড়, ইসলামিয়া কলেজ রোড, কুষ্টিয়া
চরকা, লালন শাহ্ মার্কেট, ছেঁউড়িয়া, কুষ্টিয়া

এ জাতীয় আরো সংবাদ


ফেসবুকে আমরা

ফেসবুকে আমরা