,

কুষ্টিয়ার ইতিহাসে জাতীয় বিপ্লবী শ্রমিক নেতা কমরেড শেখ রওশন আলি

ড. এমদাদ হাসনায়েন

জাতীয় বিপ্লবী শ্রমিক নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, মুক্তিযোদ্ধা শেখ রওশন আলী ১৯০৫ সালের ১৮ জুলাই কুষ্টিয়া শহরের আড়–য়াপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শেখ এলাহী বকস্ ছিলেন সাধারণ ব্যবসায়ী এবং মাতা মতিজান নেছা বিবি। রওশন আলী ছোটবেলা থেকেই অভাব অনটনের ভিতর দিয়ে মানুষ হন। ৫ বছর বয়সে স্থানীয় খ্রিস্টান মিশনারী স্কুলে ভর্তি হন। চতুর্থ শ্রেণি শেষ করার আগেই পারিবারিক কারণে স্কুল ত্যাগ করেন। অভাব অনটনের কারণে ১০/১১ বছর বয়সে রুটির দোকানে কাজ শুরু করেন এবং কাজের পাশাপাশি রাতের বেলায় বাড়িতে পড়াশোনা অব্যাহত রাখেন। অবসর সময় পাড়ার ছেলেদের নিয়ে খেলার দল গঠন করেন। এক পর্যায়ে দলনেতা হয়ে যান। এ সময় তিনি তার সহকর্মীদের নিয়ে সার্কাসের দল তৈরী করেন। ১৯৩২ সালে তিনি মোহিনী মিলের তাঁত বিভাগে চাকুরি পান।

১৯৩৩ সালে বর্ধমান থেকে কমিউনিষ্ট নেতা নিত্যানন্দ চৌধুরী কুষ্টিয়ায় আসেন মোহিনী মিলের শ্রমিকদের সংগঠিত করার জন্য। শেখ রওশন আলি শ্রমিক সংগঠন গড়ে তোলার সংগ্রামে জড়িয়ে পড়তে থাকেন এবং ক্রমেই মার্কসবাদ-লেলিনবাদের প্রতি আস্থা দৃঢ় হতে থাকে। ১৯৩৪ সালে রওশন আলির একান্ত প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মোহিনী মিল সুতাকল মজদুর ইউনিয়ন’। এই শ্রমিক সংগঠনটি মূলত শ্রমিকদের নির্যাতন থেকে মুক্তি, কাজের নিশ্চয়তা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার হতে থাকে। ১৯৩৪ সালের নভেম্বর মাস থেকে দীর্ঘদিনের পুঞ্জভূত ক্ষোভ বিস্ফোরিত হতে শুরু করে। মালিক পক্ষ প্রতিটি শ্রমিকের বেতন থেকে বাধ্যতামূলক টাকা কেটে নিতো। এই অন্যায় কাজটি মেনে নিতে পারেনি হাজার হাজার শ্রমিক। তারা ইউনিয়নের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানায়। শুরু হয় মিটিং, মিছিল ও আন্দোলন। মালিক পক্ষ সশস্ত্র হামলা চালালে কয়েকজন শ্রমিক নেতা মারাত্মক আহত হন। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন রওশন আলি। তিনি দ্রæত চিকিৎসার জন্য কলকাতায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তারা দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে কুষ্টিয়ায় ফিরে আসেন। ১৯৩৬ সালের প্রথম দিকেই শুরু হয় আন্দোলন। মালিক পক্ষ রওশন আলিকে প্রধান আসামী করে মামলা দায়ের করেন। পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেফতার করতে এলে শ্রমিকরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ইউনিয়নের পক্ষ থেকে একাধিক দাবি উত্থাপন করা হয়। সাধারণ শ্রমিক থেকে শেখ রওশন আলি ভারতবর্ষের বিপ্লবী শ্রমিক নেতা হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন। মালিক দাবির প্রতি অনমনীয় মনোভাব দেখালে ১৯৩৭ সালে শ্রমিকরা দীর্ঘকালীন ধর্মঘটে যায়। এরপর আন্দোলন আরো জোরদার হয় এবং ২ মাস ১০ দিন একটানা ধর্মঘট চলার পর মিমাংসার বিষয় আলোচিত হতে থাকে। তৎকালীন এসডিও হাবিবুর রহমান বিভিন্ন শ্রেণি পেশার লোক নিয়ে মিটিং ডেকেছেন। সেই মিটিং এ মিল মালিক রায় বাহাদুর রমাপ্রসন্ন চক্রবর্তী, শ্রমিক নেতা কমরেড অমৃতেন্দু মুখার্জী, কমরেড শেখ রওশন আলিসহ অন্যান্য সকলেই উপস্থিত ছিলেন। এসডিও’র এক প্রশ্নের উত্তরে কমরেড শেখ রওশন আলি জানালেন আমাদের সিদ্ধান্ত হবে On the merit of the case. স্বশিক্ষিত কমরেড শেখ রওশন আলি এভাবে উত্তর দিলেন, সকলেই স্তম্ভিত হয়ে গেল। মালিকপক্ষ শ্রমিকদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। ১৯৩৮ সালের মার্চ মাস থেকে মোহিনী মিল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়। এই আন্দোলনের সফলতার খবরাখবর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে যায়। কমরেড শেখ রওশন আলি হয়ে ওঠেন এক কিংবদন্তীতুল্য শ্রমিক নেতা।

শ্রমিক ইউনিয়নে সক্রিয় সংগঠক থাকার অপরাধে ১৯৩৯ সালে মোহিনী মিল থেকে রওশন আলির চাকরি চলে যায়। শেখ রওশন আলির ব্যক্তি জীবনের চাইতে তাঁর রাজনৈতিক জীবনটাই মূলত মূখ্য। ১৯৪৩ সালে সমগ্র বাংলায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। না খেয়ে হাজার হাজার মানুষ মারা যেতে থাকে। রওশন আলি মানুষের এই দু:খ সহ্য করতে পারেননি। তিনি তার কর্মীবাহিনী নিয়ে দ্বারে দ্বারে সাহায্যে চেয়েছেন। তারপর সেই অর্থ দিয়ে ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। মহাজন, মজুদদারদের বিরুদ্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছেন। ১৯৪৪ সালের শেষ দিকে দেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসতে থাকে। ১৯৪৭ সাল হতেই শ্রমিক ও কমিউনিস্ট নেতাদের বিরুদ্ধে পুলিশী হামলা শুরু হয়। কমরেড রওশন আলি, কমরেড সুধীর সান্যালসহ শ্রমিক সংগঠন ও কমিউনিস্ট কর্মীরা পুরোপুরি আত্মগোপন করেন। গোপন অবস্থায় থাকাকালীন সময়ে ১৯৪৯ সালের শেষ দিকে চুয়াডাঙ্গার ফয়েজুর রহমান জোয়ার্দ্দার সাহেবের বাড়ি থেকে তিনি গ্রেফতার হন।

ভাষা আন্দোলনে তিনি জেলে বসে উপলব্ধি করে বলেছিলেন, ‘যে জাতি ভাষার জন্য রক্ত দিতে পারে, সেই জাতিকে কেউ রুখতে পারে না। এ জাতি একদিন মুক্ত হবেই হবে।’ ১৯৫৬ সালের আগস্ট মাসে দীর্ঘদিন কারাবরণ শেষে ঢাকা সেন্টাল জেল থেকে অন্যান্য সহযোদ্ধাদের সাথে মুক্তিলাভ করেন। ঢাকা সেন্টাল জেলের ভেতর আওয়ামী লীগের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান, মামুদ আলি প্রমুখ মন্ত্রীরা যেয়ে রাজবন্দীদের সঙ্গে করে জেলের বাইরে এনে দশ সহ¯্রাধিক অপেক্ষমান জনতার হাতে দিয়ে নিজেদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জানালেন রাজবন্দীদের। বঙ্গবন্ধু কৃতজ্ঞতার সাথে কমরেডকে বললেন, রওশন ভাই আপনার নাম আমি অনেক শুনেছি। কিন্তু প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ হয়নি। আপনার ত্যাগ, আত্মউৎসর্গের কথা জাতি চিরকাল মনে রাখবে এই বাংলায়। ১৯৫৭ সালের জানুয়ারি মাসেই আবারো তাকে গ্রেফতার করা হয়। এদিকে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তি নিয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠিত হয়। জেল থেকে বেরিয়েই তিনি ন্যাপে যোগ দেন। ষাট দশকের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন দ্বিধাবিভক্ত হলে ন্যাপও দুই ভাগে বিভক্ত হয়। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শ, রণকৌশল ও বক্তব্যের প্রতি সমর্থন দিয়ে অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের নেতৃত্বে ন্যাপে যোগ দেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির মুক্তিসনদ ৬ দফা ঘোষণা করলে কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে কমরেড শেখ রওশন আলি ৬ দফা ছাত্র আন্দোলন ও সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফার প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করেন।

১৯৭২ সালের ২৩ ফেব্রæয়ারি সোভিয়েত ট্রেড ইউনিয়নের আমন্ত্রণে কমরেড রওশন আলি সোভিয়েত ইউনিয়নে যান। এই প্রতিনিধি দলের মোট সদস্য ছিলেন ছয় জন। কমরেড শেখ রওশন আলি ছিলেন শ্রমিক কৃষক তথা নির্যাতিত শ্রমজীবী মানুষের নয়নের মনি। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কুষ্টিয়ায় আসেন সরকারি সফরে। সব প্রোটোকল ভেঁঙ্গে বঙ্গবন্ধু ছুটে গিয়ে তাঁর সাথে আলিঙ্গন করলেন। তারপর দুই নেতা বসলেন আলোচনায়। কথা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আপনি তো জীবনে কিছুই পাননি, কি চান আপনি, বলুন।’ মৃদু হাসলেন কমরেড রওশন। তারপর বিনয়ীভাবে বঙ্গবন্ধুকে বললেন, ‘শ্রমিক, কৃষক, শ্রমজীবী মানুষের জন্য কিছু করুন। তবেই আমার সব পাওয়া হবে।’ কথা প্রসঙ্গে রওশন আলি সহকর্মীদের বলেছিলেন, ‘দেশের মানুষের কথা ভাবতে হলে নিজের সমস্যার কথা ভুলে যেতে হয়।’

সোভিয়েত ইউনিয়ন, পূর্ব জার্মানীসহ বিভিন্ন দেশের ট্রেড ইউনিয়নের আমন্ত্রণে তিনি বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন। আজকের ভারতের স্বনামধন্য নেতা জ্যোতি বসু, বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবসহ অনেক নেতার সংস্পর্শ পেয়েছেন।

১৯৮৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই কমরেড শেখ রওশন আলি আরো অসুস্থ হয়ে যান। তাকে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শ্রমজীবী মানুষের এক কিংবদন্তী নায়ক কমরেড শেখ রওশন আলি ১৯৮৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইংরেজ শাসনামল থেকে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত এমন কোন গণতান্ত্রিক এবং প্রগতিশীল সংগ্রাম আন্দোলন ছিল না যেখানে তাঁর অংশগ্রহণ ছিলনা। তার ত্যাগ, নিষ্ঠা, আর সংগ্রামী জীবন এলাকার মানুষের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। শুধু দেশেই নয় ভারতসহ তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক পৃথিবীতে তার কথা সবার কাছে উচ্চারিত। মার্কসবাদ-লেলিনবাদ তাত্তি¡কদের কাছে তিনি একটি আদর্শ হয়ে আছেন। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না, কমরেড শেখ রওশন আলির মূল সংগ্রাম ছিল কুষ্টিয়া জেলা তথা বাংলাদেশ এবং ভারতকেন্দ্রিক।

এ দেশে প্রগতিশীল ও শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস যারা একটু নজর করেন, তাদের সামনে অনিবার্য ভাবে এসে দাঁড়াবে কমরেড শেখ রওশন আলির নাম। প্রতিভা, বিশাল হৃদয় ও সাহস এই তিন গুণের সহাবস্থান অত্যন্ত বিরল। তার মধ্যে এই তিন গুণের সমন্বয় প্রত্যক্ষ করেছে মানুষ। মোহিনী মিল শ্রমিক আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা কমরেড রওশন আলির মধ্যে ছিল একদিকে সংগঠন গড়ার প্রতিজ্ঞা অন্যদিকে মানুষের প্রতি দরদ ও ন্যায়ের প্রতি অবিচল থাকার সাহস। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, স্বাধীকার আন্দোলন, স্বাধীনতা যুদ্ধ, ৯০ এর গণ আন্দোলনসহ গণবিরোধী সকল সংগ্রামে কমরেড শেখ রওশন আলি ছিলেন জনগণের প্রথম কাতারে। অন্যান্য নেতাদের সাথে পরামর্শ করে সমস্ত দিক নির্দেশনা দিতেন তিনি। আমৃত্যু তিনি একজন খাঁটি মানুষ ছিলেন। কমরেড শেখ রওশন আলির বিপ্লবী জীবন ঐতিহাসিক।…
—————————
বই প্রাপ্তি স্থান:
কোবাডাক হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার, লাশকাঁটার মোড়, কুষ্টিয়া
বই মেলা, এন এস রোড, কুষ্টিয়া
বই সমাবেশ, স্টেশন রোড, কুষ্টিয়া
বিদ্যাকোষ লাইব্রেরী, কোর্ট স্টেশনের পূর্বে, কুষ্টিয়া
বই নীড়, ইসলামিয়া কলেজ রোড, কুষ্টিয়া
চরকা, লালন শাহ্ মার্কেট, ছেঁউড়িয়া, কুষ্টিয়া
শরীফ বই বাগান, ১নং লালন শাহ্ মার্কেট, ছেঁউড়িয়া, কুষ্টিয়া

এ জাতীয় আরো সংবাদ


ফেসবুকে আমরা

ফেসবুকে আমরা